বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১১:৩০ পূর্বাহ্ন

বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরীর লেখনীতে মুক্তিযুদ্ধ ……প্রকাশিত সংখ্যা-১

বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরীর লেখনীতে মুক্তিযুদ্ধ ……প্রকাশিত সংখ্যা-১

::নুরুল আলম::ভাষা সংগ্রাম থেকেই আমাদের স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সুত্রপাত। চুড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকন্ঠে ঘোষনা করে ছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। শুরু হয়ে গেল বাংলার সর্বত্র স্বাধীনতার প্রস্তুতি।
একাত্তরের ২৫ মার্চ গভীর রাত্রিতে দখলদার হিং¯্র বর্বর পাক বাহিনী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পরেছিল। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল তারা। শুরু করল তারা গনহত্যা ট্যাংক চালিয়ে ও মেশিনগানের গুলি বর্ষন করে।
সেদিন ২৫ মার্চের রাতেই পাকবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হবার পূর্ব মুহুর্তে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষনা করলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনাটি পৌছিয়ে দেয়া হল চট্টগ্রামসহ দেশের সর্বস্তানে ওয়ারলেছের মাধ্যমে। ঢাকা রেডিও ষ্টেশন তখন বর্বর পাক সেনার দখলে। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ প্রচারিত হল বঙ্গবন্ধুৃর স্বাধীনতার ঘোষনার বানিটি। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সেদিন বেলা ১টার পর কয়েক মিনিট স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করেন চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা মরহুম এম এ হান্নান। এই ঘোষনা পাঠের পর পর বেতার কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই তা শুনতে পারেনি। তাই এর পরদিন অর্থ্যাৎ ২৭ মার্চ দুপুর হতে চট্টগ্রাম বেতারে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলা এবং ইংরেজীতে স্বাধীনতার ঘোষনা দেন। শুরু হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধের স্বশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম। জাতি ঝাপিয়ে পড়ল মুক্তির সংগ্রামে।
অত্যান্ত আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে আমাদের দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। যুদ্ধের নয় মাসের মধ্যে নিয়মিত সেনাবাহিনী ও গনবাহিনী সমন্বয় গঠিত মুক্তিবাহিনী দেশের প্রতিটি অঞ্চলে দুর্বার প্রতিরোধ ও আক্রমন গড়ে তুলে আমাদের বিজয়কে সেদিন সুনিশ্চিত করেছিল।
এই সংগ্রাম ছিল তাদের বাঁচা মরার সংগ্রাম। এর উপর নির্ভর করেছিল তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, অস্থিত্ব। তাই সেইদিন বাংলার দামাল ছেলেরা যে, যা পেয়েছে তাই নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। সেদিন বাংলার প্রতিটি গ্রাম গঞ্জে শহরে বন্দরে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। দেশের প্রতিটি অঞ্চল পরিণত হয়েছিল দুশমনের মৃত্যু ফাদেঁ।
প্রত্যন্ত অঞ্চল দুগর্ম পাহাড় ঘেরা অর্র্পূব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্ডিত বাংলাদেশের এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। শাসন তান্ত্রিক সুবিধার জন্য ১৮৬০ সালে বাঘাইছড়ি, মহালছড়ি, দিঘীনালা ও রামগড় থানা নিয়ে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা দ্বিতীয় মহকুমা রামগড়। গিরি মেঘলা পার্বত্য চট্টলার চেঙ্গী বিধৌত খাগড়াছড়ি ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারী রামগড় হতে মহকুমা স্থানান্তরিত হয়, তার পূর্ব মুহুর্ত পর্র্যন্ত এটা ছিল একটা ইউনিয়ন মাত্র। সদ্য প্রসূত মহকুমা সদর খাগড়াছড়ি। বর্তমান খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় আমি তখন বসবাসরত। ছাত্র জীবন থেকে রাজনীতিতে সক্রিয়া ছিলাম। ১৯৭১ সালে, আমি তখন খাগড়াছড়ি মহকুমা আওয়ামীলীগের সভাপতি।
২৫ মার্চের কালো রাত্রিতে বর্বর পাক হানাদার বাহিনী যখন ঢাকায় নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালিদের উপর ঝাপিঁয়ে পড়ে তখন খাগড়াছড়ির মানুষ গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই আমার সাংগঠনিক সম্পাদক(আওয়ামীলীগ) আনোয়ারুল আজিমের মুখে শুনতে পেলাম রামগড় আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক জনাব মরহুম সুলতান আহম্মদ তার যোগে জানাইলেন যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চের সেই সর্তক ইঙ্গিত“ তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক”। এই মন্ত্রে দিক্ষীত হয়ে আমার নেতৃত্বে নুর বক্স মিঞাকে সাধারন সম্পাদক করে একযুদ্ধ পরিচালানা কমিটি গঠন করি। উল্লেখিত কমিটিতে সক্রিয় ছিলেন, হাজী বাদশা মিঞা, জয়নাল আবেদীন খন্দকার এবং কবির আহম্মেদ আরও অনেকেই । স্বাধীনতা ঘোষণার সাথে সাথে অত্র এলাকায় গড়ে উঠে প্রতিরোধ আন্দোলনের দুর্গ। আমিও নুর বক্স মিঞা প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় খাগড়াছড়ি মহকুমার রামগড়, মহালছড়ি, দিঘীনালা ও অন্যান্য থানায় প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্য সংগ্রাম কমিটি গঠন করি। ৭ই মার্চের পর হইতে নিয়মিত মিটিং মিছিলে মুখরীত ছিল খাগড়াছড়ি মহকুমা সদর। ২৬ মার্চ থেকে আওয়ামীলীগ, ছাত্র জনতাকে একত্রিত করে সকাল ১০ টায় মিছিলসহকারে মহকুমা প্রশাসকের অফিসে গিয়ে, পাকিস্থানী পতাকা নামীয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি।
ইতিমধ্যে রামগড়ের মরহুম সুলতান আহম্মেদ আমাকে জানালেন যে, লৌগাং বা তাইন্দং এ একজন বাঙালি মেজর স্ব-পরিবারে আত্ম গোপন করে আছেন। আমি ২৭ মার্চ সকালে একটি জীপ নিয়ে লৌগাং যাই। সেখানে মেজরকে না পেয়ে ওয়ারলেছ যোগে তাইন্দং এ তার সাথে যোগাযোগ করি। আমি তাকে অনুরোধ করি, দেশের এই ক্লান্তি লগ্নে তারমত একজন যোগ্য পরিচালকের বিশেষ প্রয়োজন। মেজর নাম আবুল কাশেম। আমার অনুরোধে তিনি রামগড়ে যান।
২৯ শে মার্চে মরহুম জহুর আহম্মেদ চৌধুরী এম আর ছিদ্দিকী ও অন্যান্য জননেতাবৃন্দ রামগড়ে আসেন এবং ঐদিনই সাহায্যের জন্য আগরতলা চলে যান। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রামগড়ের ভুমিকা বিশেষ উল্লেখ যোগ্য। এই প্রতিরোধ আন্দোলনের যোগ্য বলিষ্ঠ্য নেতৃত্ব দেন মরহুম সুলতান আহম্মেদ। আর স্বাধীনতা কামী জনগণ, আওয়ামীলীগের সংগ্রামী নেতৃবৃন্দ সাহায্যের জন্য ছুটেযান রামগড়ে।
অন্যদিকে সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব শীল ই,পি,আর সদস্যরা হানাদার পাকিস্তানী সৈন্যদের পরাভূত করে রামগড়ে আসতে থাকে। আমি ও নুর বক্স মিঞা তাদের সংগঠিত করি। আমরা চট্টগ্রাম, কাপ্তাই, চন্দ্রঘোনা রাঙামাটি হইতে আগত মুক্তিযোদ্ধোদের মহালছড়ি হইতে খাগড়াছড়ি জড়ো হয় এবং জীপ যোগে রামগড় পৌছে দেই। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মহালছড়িতে একটি লঙ্গর খানা ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠিত করণ স্থাপন করি। এই ক্যাম্প ও লঙ্গর খানার সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন মহালছড়ির মোবারক আলী মাস্টার। কিন্তু সেই সময় অভাব ছিল সামরিক অফিসার, গোলাবারুদ ও অস্ত্র শস্ত্রের। প্রথম দিকে অফিসার বলতে ছিল কয়েকটা ৩০৩ রাইফেল ও কয়েকটা চাইনিজ রাইফেল। ৭দিনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য গোলা বারুদ সংগ্রহ ও যাথস্থানে পৌছানোর দায়িত্ব পড়ে রামগড় আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মরহুম সুলতান আহম্মেদ ও আমার উপর।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি

Design & Developed BY CHT Technology
error: Content is protected !!